—নিবেদিতা মিত্র, 64 শোভাপুর এভিনিউ,দুর্গাপুর
৭৬ তম জন্মদিনে 6xnews এর পক্ষ থেকে তাঁর কর্ম জীবন সমন্ধীয় একটি সংক্ষিপ্ত প্রতিবেদন

মোহন সিং খানগুরা একজন বিশিষ্ট ভারতীয় শাস্ত্রীয় সংগীত শিল্পী এবং রবীন্দ্র সংগীত বিশারদ। তাঁর জীবন ও কর্মজীবন পাঞ্জাবি ও বাঙালি সংস্কৃতির এক অনন্য সংমিশ্রণ। যার সঙ্গীতযাত্রা মূলত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শান্তিনিকেতনের পরিসরে বিকশিত হয়েছে।মোহন সিংহ খানগুরার জীবন সঙ্গীতের শক্তিকে তুলে ধরে, তাঁর জীবন আমাদের শেখায়, শারীরিক প্রতিবন্ধকতা, ভাষাগত সীমাবদ্ধতা কিংবা সাংস্কৃতিক পার্থক্য কোন কিছুই সৃষ্টিশীলতারপথে বাধা নয়।পাঞ্জাবে জন্ম হয়েও কি করে তাঁর জীবন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শান্তিনিকেতনের পরিসরে বিকশিত হলো সেই কাহিনী এখানে বলা হয়েছে।

১৯৪৯ সালের ১ম অক্টোবর, অর্থাৎ আজকের দিনে,পাঞ্জাবের লুধিয়ানা জেলার গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। একটি শিক্ষিত, সংগীত এর প্রতি অনুরাগী, উদার পরিবারে তার জন্ম হয়। তাঁর পিতা একজন সেনা কর্মকর্তা হয়েও সংগীতের খুব অনুরাগী ছিলেন এবং শৈশব থেকেই তার ছেলের মধ্যে এই ভালোবাসা সঞ্চার করেছিলেন। তাঁর মা বাড়িতে পাঞ্জাবি লোক গান গাইতেন এবং মোহন সিং তাঁর মায়ের কাছ থেকে লোকগানের সেই শক্তিশালী অথচ সুরেলা সৌন্দর্য শিখেছিলেন।

মাত্র ৭ বছর বয়সে তিনি পোলিও রোগে আক্রান্ত হন এবং তার পাদুটি অকেজো হয়ে যায়।এই অসুখ তাকে সঙ্গীতের প্রতি অনুরাগ থেকে বিরত করতে পারেনি, বরঞ্চ সংগীতকেই জীবনের মূল উপাদ্য রূপে তিনি গ্রহণ করেন।যা তার কর্ম কর্মজীবনের দিকে তাকালেই স্পষ্ট বোঝা যায়।

তিনি কবে কখন তাঁর সঙ্গীত জীবন কখন শুরু করেছিলেন তা তিনি মনেও করতে পারেন না। তবে বিদ্যালয়ের দিনগুলিতে তিনি কিভাবে প্রকাশ্যে গান গেয়েছিলেন তা তাঁর স্পষ্টভাবে তার মনে আছে। গানের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ দেখে এবং গান গাওয়ার দক্ষতা লক্ষ্য করে বিশিষ্ট অভিনেতা বলরাজ সাহানি তাকে শান্তিনিকেতনে ,সংগীতে উচ্চশিক্ষার জন্য উৎসাহিত করেন।

মোহন সিং তৎকালীন উপাচার্য মাননীয় শান্তিদেব ঘোষকে একটি ব্যক্তিগত চিঠি লেখেন, যে তিনি শান্তিনিকেতনে সংগীতে উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হতে চান। তিনি যেহেতু শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধকতার শিকার সেই কারণে শান্তিনিকেতনে গিয়ে আবার ফিরে আসা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়।সপ্তাহখানেক এর মধ্যে সেই চিঠির উত্তর আসে তাতে লেখা ছিল “তোমার বিছানা পত্র এবং বাক্স নিয়ে এখানে চলে এসো”। শ্রদ্ধেয় শান্তিদেব ঘোষ তাঁর দাদাকে বলেন “মোহন এখন আমাদের দায়িত্ব ,আপনি নিশ্চিন্ত হয়ে ফিরে যান”।

এই ভাবেই তিনি সংগীত ভবনে বা শান্তিনিকেতনে ভর্তি হন যা তাঁর জীবনে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনে।মোহন সিংকে কদমতলা হোস্টেলের একটি কক্ষ বরাদ্দ করা হয়। যার পাশের কক্ষে আগে বাবা আলাউদ্দিন খাঁ একসময় থাকতেন,বলা যায় শিক্ষার শুরুতেই পরোক্ষভাবে তিনি এক মহান ব্যক্তিত্বের সংস্পর্শে এসেছিলেন ।

প্রথম দিনেই তিনি শান্তিনিকেতনের গ্রামীণ পরিবেশে এসে তিনি এক আশ্চর্য অনুভূতি পান। তাঁর মনে হয়েছিল শান্তিনিকেতনের সঙ্গে যেন তার অনেক দিনের পরিচয়।প্রথম দিনের দর্শনেই তিনি শান্তিনিকেতনের গাছপালা,পাখি গ্রাম্য পরিবেশের সাথে একাত্ম হয়ে যান। তৎকালীন(১৯৬৭) শান্তিনিকেতন সম্বন্ধে বলতে গিয়ে তিনি বলেছেন, তখন শান্তিনিকেতন ছিল বিরল জনবসতিপূর্ণ এক জায়গা, যেখানে জার্মানি, রাশিয়া চিন প্রভৃতি দেশের নাগরিকরা নিচু স্বরে তাদের সঙ্গীতের কথা বলতে বলতে হেঁটে চলতেন ।তার মনে হতো পুরো বিশ্ব যেন শান্তিনিকেতনে একত্রিত হয়েছে।
মোহন সিং বিশ্বভারতীর সংগীত ভবনে ভর্তি হন যদিও তখন তাঁর বাংলা ভাষার গান ছিল না। তিনি যাদের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেন তাঁরা হলেন পন্ডিত ধ্রুবতারা জোশি, সুধীশ বন্দ্যোপাধ্যায় ,অশেষ বন্দোপাধ্যায় প্রমুখ দিকপালরা ,ফলে খুব তাড়াতাড়ি তিনি ভারতীয় সংগীতের ধ্রুপদী শাখায় তথা রবীন্দ্রসঙ্গীতে পারদর্শী হয়ে ওঠেন।

এই কারণে জন্মসূত্রে পাঞ্জাবি হলেও তিনি নিজেকে শান্তিনিকেতনের সন্তান বলে পরিচয় দিতে ভালোবাসেন। শাস্ত্রীয় সংগীতে দক্ষ হলেও রবীন্দ্রসঙ্গীতে তার অবদান প্রশংসিত ।তিনি বিশ্বাস করেন রবীন্দ্রসঙ্গীতের মূল সৌন্দর্য তার আবেগ ও আত্মিক প্রকাশে , নিছক কারিগরি নিখুঁততায় নয়। তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এর “ভাঙাগান” অত্যন্ত সমৃদ্ধ ও শৈল্পিকভাবে পরিবেশন করেন । তিনি রাষ্ট্রপতি পুরস্কার, সংগীত নাটক একাডেমী পুরস্কার এবং বঙ্গবিভূষণ পুরস্কারসহ বহু সম্মান লাভ করেছেন যা ভারতীয় সংগীতে তার অসামান্য অবদানকে স্বীকৃতি দেয় ।
এই সম্মান শুধু তাঁর ব্যক্তিগত অর্জন নয় বরং একটি ভারতীয় সংগীতের বহুমাত্রিক বা বহু শাখাকে তুলে ধরার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। এখনো তিনি সক্রিয়ভাবে সংগীত চর্চা পরিবেশন করছেন এবং নিয়মিতভাবে সঙ্গীতের বিভিন্ন ধারায় বিশেষত রবীন্দ্রসংগীত, খেয়াল খেয়াল, ধ্রুপদ ও পাঞ্জাবি লোকসংগীত চর্চা ও পরিবেশন করে চলেছেন। মোহন সিং খানগুরার সংগীত জীবন শুধুমাত্র তার অসাধারণ দক্ষতা ও আবেগপূর্ণ পরিবেশনার জন্য নয় বরং তার সাংস্কৃতিক সংযোগ ও শিক্ষাদানের জন্য বিশেষভাবে প্রশংসিত।আমরা তার আরো দীর্ঘ জীবন কামনা করি।

[লেখিকা নিবেদিতা মিত্র একজন বিশিষ্টরবীন্দ্রসংগীত শিল্পী এবং দুর্গাপুর গার্লস স্কুল এর প্রাক্তন গ্রন্থাগারিক,এই নিবন্ধটি লেখার জন্য 6xnews পক্ষ থেকে তাঁকে আন্তরিক ধন্যবাদ ]
পরিশেষে আমরা তার গাওয়া কিছু গানকে এই নিবন্ধে সংযোজিত করলাম। গানগুলি অবশ্যই শুনুন আপনার আজকের দিনটি এক অনন্য অনুভূতির সঙ্গে শুরু হবে।